শনিবার   ১৯ অক্টোবর ২০১৯   কার্তিক ৩ ১৪২৬   ১৯ সফর ১৪৪১

গো বিডি ২৪

মহারাজা স্কুল ট্রাজেডি

দ্বিজেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী- বাংলাদেশের সেরা শিক্ষক হিসেবে দু’বার রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কারপ্রাপ্ত

প্রকাশিত: ১৫ জানুয়ারি ২০১৯  

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। স্বাধীনতার জন্য এত লোকক্ষয় হয়তো পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গঁবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে বাঙ্গালির মনে জাগ্রত হয় স্বাধীনতা অর্জনের অদম্য বাসনা। তিনি দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করেছিলেন- “মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। তবু এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এ বারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এই স্বাধীনতার সংগ্রাম চলে সুদীর্ঘ নয় মাস। এতে ত্রিশ লক্ষ বাঙ্গালিকে প্রাণ দিতে হয় আর সম্ভ্রম হারান দুই লক্ষ মা-বোন। বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রাণপণ প্রচেষ্টায় এবং ভারতীয় বাহিনীর সহযোগিতায় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমাদের চির আকাঙ্খিত বিজয় অর্জিত হয়। ঐতিহাসিক এই দিনে অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সময় বিকেল ৪ টায় রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হন নব্বই হাজারেরও বেশি সেনা সদস্য নিয়ে পূর্বাঞ্চলের সেনানায়ক জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি। আত্মসমর্পনের দলিলে স্বাক্ষর করেন ভারতের লেফটেনেন্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোর এবং পাকবাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজি। এরপর আনন্দে আত্মহারা হয় সমগ্র বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর সমস্ত মুক্তিপাগল মানুষ। এই মহান বিজয় দিবসের ঠিক ২১ দিন পর দিনাজপুর শহরে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক দূর্ঘটনা। সেটি হচ্ছে মহারাজা স্কুল ট্রাজেডি। এই ট্র্যাজেডি বর্ণনার পূর্বে মহারাজা স্কুল সম্পর্কে কিছু বর্ণনা করা যাক। স্কুলটির ডাক নাম মহারাজা স্কুল। এর পুরো নাম মহারাজা গিরিজানাথ উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দিনাজপুর রাজবংশের সপ্তম পুরুষ মহারাজা স্যার গিরিজানাথ রায় বাহাদুর। ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে দিনাজপুর জেলান্তর্গত চিরিরবন্দর থানার নিকট দামুর নামক গ্রামের এক মধ্যবিত্ত জমিদার পরিবারে গিরিজানাথের জন্ম হয়। জন্মের পর পরই তিন দিনাজপুর রাজবংশের দত্তক পুত্ররূপে রাজবাড়ীতে নীত হন। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৯১৯ সালের ২১ ডিসেম্বর। তিনি ছিলেন বিদ্বান, দানশীল, বিচক্ষণ, প্রজাবৎসল বিদ্যোৎসাহী ও বিদ্যানুরাগী। এই মহানুভব মহারাজা দিনাজপুর শহরের পূর্বাংশে বালুবাড়ী এলাকায় মহারাজা গিরিজানাথ উচ্চ বিদ্যালয়টি নির্মানের জন্য ২৬ বিঘা জমি এবং প্রচুর অর্থ দান করেছিলেন। তারই ফলশ্রুতিতে ১৯১৩ সালে এই ঐতিহ্যবাহী মহারাজা গিরিজানাথ উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। মহারাজা স্কুলের সুউচ্চ বিরাট হলঘরের উত্তর দেওয়ালের মধ্যস্থলে কাঁচযুক্ত একটি বড় আকারে খিলান (আর্চ) এর নিচে MAHARAJA GIRIJANATH H.E. SCHOOL ESTD-1913  অংকিত ছিল। আর বাইরে দেয়ালে লেখা ছিল THIS FOUNDATION STONE IS LAID BY H.E. THE RIGHT HON'BL THOMAS DAVID BARON CARMICHEAL OF SKIRILING G.C.I.E.K.C.M.G. GOVERNOR OF BENGAL IN NOVEMBER 1913. বিদ্যালয় ভবনটির বহিরাংশে পলেস্তরমুক্ত পয়েন্টিংযুক্ত সাধারণ সুন্দর স্থাপত্যরীতি, অপরূপ গঠন বিন্যাস, মার্জিত শিল্পসৌকর্ষ সর্বোপরি উজ্জ্বল খয়েরি রং এর রক্তিম আভায় এ স্কুল ভবনটি যেমন ছিল মহিমান্বিত, তেমনি ছিল আপন সৌন্দর্যে সমুজ্জ্বল। সমতল থেকে ৪ ফুট উচু পাটাতনের উপর নির্মিত হয়েছিল এই রাজকীয় স্কুল ভবনটি।
এবার আসা যাক মহারাজা স্কুল ট্রাজেডিতে। দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়ের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে মহারাজা গিরিজানাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি ট্রানজিট ক্যাম্প তৈরি হয়। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পুতে রাখা, ফেলে রাখা এবং ছেড়ে যাওয়া মাইন, বোমা, এন্টি ট্যাংক মাইন, এন্টি পারসোনাল মাইন, জ্যাম্পিং মানি, মর্টারের দুই-তিন ইঞ্চি শেল, গ্রেনেড ইত্যাদি সংগ্রহই এই ক্যাম্পের অন্যতম প্রধান কাজ। এই ক্যাম্পের সার্বিক নেতৃত্বে ছিলেন লে. ক. শাহরিয়ার (বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত)।
অদ্যাবধি সঠিক তথ্য জানা না গেলেও বিভিন্ন সুত্রে এবং বেচে যাওয়া কিছু বীর মুক্তিযোদ্ধার জবানবন্দী থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে জানা যায় যে, ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি গোলাবারুদ ও মাইন ভর্তি দুটি ট্রাক (কারো মতে তিনটি ট্রাক) মহারাজা স্কুলের মাঠে প্রবেশ করে। ট্রাক থেকে অস্ত্র খালাসের কাজ শুরু হয় বিকাল ৪ টায়। বাংকার থেকে ট্রাকের দুরত্ব ছিল ১০০ গজ। কমান্ডারের বাঁশির শব্দে কিছু মুক্তিযোদ্ধা ট্রাক থেকে অস্ত্র নামানোর কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তারা হাত বদলের মাধ্যমে ঐ ১০০ গজ দূরত্বের বাংকারে মাইনসহ অন্যান্য অস্ত্রগুলি পৌঁছাতে থাকেন। এই হাতবদলের সময় জনৈক মুক্তিযোদ্ধার হাত থেকে একটি মাইন বিস্ফোরিত হয়ে যায়। সাথে সাথে মাইনটি বিস্ফোরিত হয়। তার সাথে বাংকারটি বিস্ফোরিত হয়ে যায়। সাথে সাথে বাংলাদেশের ঐতিহ্যমন্ডিত মহারাজা গিরিজানাথ স্কুল ভবনটি যেন আকাশে উড়ে যায়। আর তারি সাথে আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ মুক্তিযোদ্ধা অকালে প্রাণ হারান মাইন বিস্ফোরণে। স্কুলটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে সেখানকার মাটি পর্যন্ত উড়ে গিয়ে প্রকান্ড একন্ড পুকুরের সৃষ্টি হয় এবং ভেতরে থেকে অতলস্পর্শী পানি বের হতে থাকে।
সূর্য তখন অস্তগামী। আকাশে লাল আভা। বিস্ফোরণের শব্দে দিনাজপুরের মাটি কেঁপে ওঠে। প্রচন্ড ভূমিকম্পেও এত বেশি কাপাকাপি হয় না। শহর-বন্দর-গ্রাম। চতুর্দিক ধোয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়। প্রায় একশত মাইল দুর থেকে এই শব্দ শোনা গিয়েছিল সেদিন। আমি সেদিন অবস্থান করেছিলাম পশ্চিমবঙ্গেঁর কুমারগঞ্জ থানার মাঠে। সেখানে যে শব্দ আমরা সকলে শুনেছিলাম তাতে মনে হয়েছে যে, ঐ শব্দের আরও পঞ্চাশ মাইল দুরে যাওয়া ছিল খুবই স্বাভাবিক।
দূর্ঘটনার পরপরই দিনাজপুর শহরের হিতৈষী জনগন উদ্ধার কাজ শুরু করেন। পরে ভারতীয় মিত্রবাহিনী উদ্ধার কাজে যোগ দেন। অন্ধকার ক্রমান্বয়ে ঘনিয়ে আসে। কোনদিকে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। তদুপরি বিষাক্ত গ্যাস আর ধোঁয়ায় পরিবেশ যেন নরককুন্ডে পরিণত হয়েছিল। আহত-অর্ধমৃত মুক্তিযোদ্ধাদের আর্তনাদ, মুমূর্ষদের চিৎকার আর কান্নাকাটিতে মহারাজা গিরিজানাথ স্কুল প্রাঙ্গণ যেন অমরাবতী থেকে মুহুর্তের মধ্যে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল। মৃত মুক্তিযোদ্ধাদের আর আহত মুক্তিযোদ্ধাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গ স্কুল বিল্ডিং এর ইট আর লোহা লক্করের সাথে মিশে উড়ে গিয়েছিল পশ্চিম আর উত্তর দক্ষিণে শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে আর পূর্ব দিকে সুবিস্তীর্ণ ধান ক্ষেত, ঝাড়, জঙ্গল, ডোবা-নালা, পুকুর আর খাল বিলে। ২৬ বিঘার সমস্ত স্কুল মাঠে রক্তের ¯্রােত বয়েছিল। নতুন সৃষ্ট পুকুরটি রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। স্কুলের সামান্য ভগ্ন অংশ হতবিহ্বল চিত্তে দাড়িয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত তাকিয়ে ছিল। অন্ধকারে মৃত দেহগুলির খন্ড খন্ড দেহাংশ, দলা দলা মাংস, কোথাও মাথা, কোথাও দেহ, কোথাও হাত, পা সেকি বিভৎস দৃশ্য, যা কুরক্ষেত্রের যুদ্ধের বর্ণনাতেই কেবল পাওয়া যায়।
প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে, সকালে মুক্তিযোদ্ধাদের রোল কল করা হয়েছিল। তখন সর্বোমোট ৭৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা উপস্থিত ছিলেন। এরপর অনেকেই ২/১ দিনের ছুটি নিয়ে বাবা-মা-স্ত্রী-পুত্রের সাথে দেখা করার জন্য চলে যান। আর কেউ কেউ শহরে ঘুরতে চলে যান। তাই দুর্ঘটনার সময় কতজন সেখানে উপস্থিত ছিলেন তা বলা সম্ভব ছিল না। ঘন অন্ধকারে গাড়ীর লাইট জ্বালিয়ে, টর্চ লাইন, হ্যাচাক লাইট ও লন্ঠনের আলোয় রাতভর উদ্ধার কাজে শহর ও গ্রামের সর্বস্তরের জনগণ অংশগ্রহণ করেন।
এখানে বলে রাখা ভালো যে, দিনাজপুরবাসীকে বহুবার স্বদেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছিল। যেমন- তেভাগা আন্দোলন, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, স্বাধীনতার আন্দোলন, ইয়াসমিন হত্যার আন্দোলন, মহারাজা স্কুল ট্রাজেডিতে উদ্ধার তৎপরতা ইত্যাদি। পরদিন প্রথমে ৮৬ জনের লাশ, পরে আরো ২১ জনের লাশ দিনাজপুর শহরের উত্তরে চেহেলগাজী মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়। লাশগুলোর অধিকাংশই ছিন্ন ভিন্ন ছিল। কারো হাত, কারো পা, কারো মাথা জোড়া লাগিয়ে এক একটি লাশের আদল দেওয়া হয়েছিল। কোন যাচাই বাছাই করা মোটেই সম্ভব ছিল না। তাই হয়তো কোনো লাশের দুটা হাতই ছিল ডান হাত অথবা দুটা পা ছিল বাম পা। একজনের মাথা আর একজনের শরীরে লাগিয়ে লাশের আকৃতি করা হয়েছিল। হাসপাতালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের আর্তনাদে বাতাস সেদিন ভারি হয়ে গিয়েছিল। প্রকৃতি ছিল নীরব, নিথর, হতভম্ব, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সব লাশকেই যে মস্তক বা হাত-পা দেওয়া হয়েছিল হয়তো সেটাও নয়। মহারাজা স্কুল মাঠ থেকে ৪ মণ দলা দলা মাংস উদ্ধার করা হয়েছিল। ভগ্ন দালান আর বিস্ফোরিত অস্তের ভেতর থেকে এবং শহরের দালানের ছাদ, রাস্তা-ঘাট, ধান ক্ষেত, ডোবা-নালা থেকে লাশের খন্ডিত অংশ সংগ্রহ করতে বেশ কয়েকদিন সময় লেগেছিল। এতে করে দেহের বিভিন্ন অংশে পচন ধরায় দূর্গন্ধে আকাশ বাতাসসহ পরিবেশ ভীষণভাবে দূষিত ও ভারি হয়ে গিয়েছিল।
১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারীর দূর্ঘটনায় আহত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ (পিতা- মাহাতাব উদ্দীন, গ্রাম- বলঞ্চা, থানা- রাণীশংকৈল, জেলা- ঠাকুরগাঁও) স্মৃতি চারণ করে লিখেছেন, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস পালন করি রাণীশংকৈল থানার নেকমরদে। এখান থেকে দিনাজপুরে একত্র হওয়ার নির্দেশ পেয়ে আমরা ১৫ সদস্যের একটি গ্রুপ ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি দিনাজপুর মহারাজা গিরিজানাথ হাই স্কুলে গিয়ে হাজির হই এবং ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার এর কাছে আমাদের হাতিয়ার জমা দিয়ে অবস্থান গ্রহণ করি। স্কুলের মাঝের কক্ষটিতে আমরা বিছানা করে নেই। আমাদের গ্রুপের কারো থালা বাসন ছিল না। অন্যের থালায় খানা খেয়ে যার যার বিছানায় শুয়ে পড়ি। কয়েকদিন আগে থেকেই আমার জ্বর এবং শরীর ও মাথা ব্যথা ছিল। সুতরাং খাওয়ার পর বাইরে যাওয়ার কোন ইচ্ছা হলো না। ৬ জানুয়ারী আমি ও সিরেন চন্দ্র মধ্যাহ্নভোজনের পর বিছানায় বসে বসে নিজেদের বাড়ির গল্প করেছি। কারণ ৫ জানুয়ারী বুধবার আমার সাথী ও প্রতিবেশী মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল, বিরেন্দ্রনাথ ও আমার এক চাচা ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে গেলো। আমিও ছুটি চেয়েছিলাম, কিন্তু দিলো না। তাই আমি অসুস্থ শরীরে, দুঃখভরাক্রান্ত মনে সিরেন চন্দ্রের সঙ্গে এক বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। বিকেল ৫ টার দিকে সৈয়দপুর থেকে মাইন ও বিস্ফোরক দ্রব্য বোঝাই দুটি ট্রাক আসে। সবাইকে ফলিন হওয়ার জন্য হুইসেল দেয়া হয়। আমি অসুস্থতার কারণে বের না হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ি। আমার পাশে সিরেন চন্দ্রও শুয়ে পড়ে। অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা ট্রাক থেকে মাইন নামানো শুরু হলো। ছোট ছোট বিস্ফোরকগুলো আমাদের পাশের রুমে এবং বড় ধরনের মাইনগুলো এক গর্তে রাখা হচ্ছিল। পাশেই একটি মসজিদে আযান শুরু হলো। আযান শেষ না হতেই হঠাৎ একটা বিদ্যুতের চমক এবং প্রকম্পিত বিকট আওয়াজ শুনতে পেলাম। তারপরে কী হলো আমি আর কিছুই বলতে পারি না। পরের দিন সকাল ৯টায় নিজেকে আবিস্কার করলাম সদর হাসপাতালের বিছানা। জ্ঞান ফেরার পর হাসপাতালে আরো অনেককে দেখতে পেলাম বেহাল অবস্থায়। জানতে পারলাম যে, আমার সাথী সিরেন বেঁচে নেই।
দিনাজপুরের সাবেক সাংসদ এম আব্দুর রহিম, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আখতার এবং সাংবাদিক আজহারুল আজাদ জুয়েলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ১২ জন নিহত এবং ৪৪ জন আহত মুক্তিযোদ্ধার নাম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। আহত ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সংগৃহীত নামের তালিকা নিয়ে সাবেক সাংসদ জনাব আব্দুর রহিমের চেষ্টায় মহারাজা গিরিজানাথ হাই স্কুলের মাঠে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয় ২০০০ সালের ৬ জানুয়ারী। বিডিআর এর তৎকালীন মহাপরিচালক আ ন ম ফজলুর রহমান এটা উদ্বোধন করেন। চেহেলগাজী মাজার প্রাঙ্গণে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের গণসমাধির সৌধে বেঙ্গল রেজিমেন্ট একটি স্মৃতিফলক দেয়। স্থানীয় জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধির সামনে একটি ছোট শহীদ মিনার তৈরি করেন। মহারাজা গিরিজানাথ উচ্চ বিদ্যালয়টির ভগ্নাবশেষ ভেঙ্গে ফেলা হয়। পরে সেখানে একটি সাধারণ স্কুল ভবন (একতলা) তৈরি করা হয়। এরপর স্কুল মাঠের উত্তর প্রান্তে একটি সুবৃহৎ চারতলা ভবন তৈরি করা হয়। প্রতিবছর ৬ জানুয়ারী মহারাজা স্কুলমাঠে গণজমায়েত, শহীদ মিনারে পুস্পস্তবক প্রদান ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

 

Loading...